ঢাকাবুধবার, ২রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, দুপুর ১:১৯
আজকের সর্বশেষ সবখবর

দেশের নাগরিকের সংবেদনশীল তথ্য বিদেশি কোম্পানির হাতে।

নিজস্ব প্রতিবেদক
সেপ্টেম্বর ১, ২০২৬ ৩:৩৫ অপরাহ্ণ
পঠিত: 51 বার
Link Copied!

দুবাইয়ে ই-পাসপোর্ট সেবা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার উদ্যোগ অর্থ মন্ত্রণালয়ের আপত্তি ও নীতিমালা নিয়ে প্রশ্ন, নাগরিক তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আপত্তি এবং বিদ্যমান নীতিমালা নিয়ে প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে বাংলাদেশ মিশনে ই-পাসপোর্টসহ গুরুত্বপূর্ণ কনস্যুলার সেবা একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে রাষ্ট্র ও নাগরিকের সংবেদনশীল তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট নথি ও দায়িত্বশীল একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দুবাইয়ে বর্তমানে এমআরপি সেবায় সহযোগিতা করা একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বের পরিধি বাড়িয়ে ই-পাসপোর্ট প্রক্রিয়াকরণসহ অন্যান্য কনস্যুলার সেবা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

অভিযোগ উঠেছে, বিদেশে বাংলাদেশ মিশনে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে এ ধরনের সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান নীতিমালা এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের আপত্তির বিষয়টি যথাযথভাবে নিষ্পত্তি না করেই প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

২০২৩ সালের চুক্তি, এবার দায়িত্বের পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৩ সালের ১৭ নভেম্বর দুবাইয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনের সঙ্গে মালয়েশিয়ার কোম্পানি ‘ফশওয়া এসডিএন বিএইচডি’-এর স্থানীয় অপারেটর ‘ফশওয়া গ্লোবাল ডকুমেন্টস কপিইং সার্ভিস কোম্পানি এলএলসি, দুবাই’-এর চুক্তি হয়।
চুক্তির আওতায় প্রতিষ্ঠানটির মূল দায়িত্ব ছিল মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) প্রদানে সহযোগিতা করা।
কিন্তু সম্প্রতি সেই দায়িত্বের পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো একটি বিবেচ্যপত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে এমআরপি সেবায় সহযোগিতার পাশাপাশি ই-পাসপোর্ট প্রক্রিয়াকরণসহ অন্যান্য কনস্যুলার সেবা কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এখানেই উঠছে বড় প্রশ্ন
এমআরপি সেবায় সহযোগিতা এবং ই-পাসপোর্ট প্রক্রিয়াকরণ এক ধরনের কাজ নয়। ই-পাসপোর্ট ব্যবস্থার সঙ্গে নাগরিকের পরিচয়, ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি, স্বাক্ষর এবং বায়োমেট্রিক তথ্যসহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জড়িত।
ফলে একটি বিদেশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে এ ধরনের সেবার দায়িত্ব গেলে প্রতিষ্ঠানটির কাছে ঠিক কতটুকু তথ্যের প্রবেশাধিকার থাকবে, তথ্য কোথায় সংরক্ষিত হবে এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ কীভাবে নিশ্চিত করা হবে—এসব প্রশ্ন সামনে এসেছে।

‘ডেটাই এখন রাষ্ট্রের শক্তি’
সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক তানভীর হাসান জোহা বলেন, নাগরিকের তথ্য একটি দেশের ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তার ভাষায়, “আজকাল যুদ্ধ শুধু অস্ত্র দিয়ে হয় না, ডেটা দিয়েও হয়। একটি দেশের নাগরিক ডাটাবেজ মানে সেই দেশের ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব।”
তার মতে, নাগরিকদের সংবেদনশীল তথ্য ব্যবস্থাপনায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানের প্রবেশাধিকার তৈরি হলে তথ্যের নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

কোন তথ্যগুলো ঝুঁকিতে পড়তে পারে?
ই-পাসপোর্ট প্রক্রিয়ায় নাগরিকের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে রয়েছে পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য, জন্মতারিখ, ঠিকানা, ছবি, স্বাক্ষর, পাসপোর্টসংক্রান্ত তথ্য এবং বায়োমেট্রিক তথ্য।
এসব তথ্য কোনোভাবে অননুমোদিত ব্যক্তির হাতে গেলে ব্যক্তিগত নিরাপত্তার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিষয়ও সামনে আসতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রশাসনের ভেতরেও আপত্তি
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, প্রস্তাবিত ব্যবস্থাকে ঘিরে প্রশাসনের ভেতরেও আপত্তি ও প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে বিদ্যমান নীতিমালা, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অবস্থান এবং নাগরিক তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

এরপরও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে যাওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে—নীতিগত ও নিরাপত্তাগত বিষয়গুলো পুরোপুরি নিষ্পত্তির আগেই কেন বিদেশি একটি প্রতিষ্ঠানের হাতে রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ সেবার দায়িত্ব দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে?
তথ্য কোথায় থাকবে, নিয়ন্ত্রণ কার হাতে?
প্রস্তাবিত ব্যবস্থার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া জরুরি—
১. নাগরিকের তথ্য কোথায় সংরক্ষণ করা হবে?
২. বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কোন কোন কর্মী এসব তথ্য ব্যবহারের সুযোগ পাবেন?
৩. তথ্য বাংলাদেশের বাইরে স্থানান্তর বা সংরক্ষণ করা যাবে কি না?
৪. প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি শেষ হলে সংগৃহীত তথ্য ও ব্যাকআপের কী হবে?
৫. তথ্য ফাঁস বা সাইবার হামলার ঘটনা ঘটলে দায়ভার কার ওপর বর্তাবে?
৬. বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত সেবার ওপর বাংলাদেশ সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ কীভাবে নিশ্চিত করা হবে?
সেবা সহজ করার যুক্তি, কিন্তু নিরাপত্তার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ
দুবাইয়ে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি বসবাস করেন। তাদের দ্রুত পাসপোর্ট ও কনস্যুলার সেবা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সম্প্রসারণের মাধ্যমে প্রবাসীদের ভোগান্তি কমানোও জরুরি।
তবে সেবা দ্রুত ও সহজ করার পাশাপাশি নাগরিকের তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
বিশেষ করে এমআরপি থেকে ই-পাসপোর্টে দায়িত্বের পরিধি বাড়ানোর ক্ষেত্রে নতুন করে নিরাপত্তা মূল্যায়ন, আইনি কাঠামো, চুক্তির শর্ত এবং তথ্য ব্যবস্থাপনার পদ্ধতি স্পষ্ট করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এখন মূল প্রশ্ন
২০২৩ সালে যে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির আওতা ছিল মূলত এমআরপি সেবায় সহযোগিতা, সেই একই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বের পরিধি বাড়িয়ে ই-পাসপোর্টসহ অন্যান্য কনস্যুলার সেবা দেওয়ার উদ্যোগ কতটা নীতিসঙ্গত এবং নিরাপদ—এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আপত্তি, বিদ্যমান নীতিমালা এবং নাগরিক তথ্যের নিরাপত্তা—এই তিনটি বিষয় কীভাবে সমন্বয় করা হবে, সেটিও পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
কারণ পাসপোর্ট শুধু একটি ভ্রমণ নথি নয়; এটি একজন নাগরিকের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

তাই প্রবাসীদের সেবা সহজ করার নামে এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত নয়, যাতে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভান্ডার কিংবা নাগরিকের সংবেদনশীল তথ্যের ওপর অনাকাঙ্ক্ষিত তৃতীয় পক্ষের নিয়ন্ত্রণ তৈরি হয়।
নিউজরুম বিডি ২৪-এর অনুসন্ধান অব্যাহত থাকবে।