ঢাকার মিরপুরে ৫০ বছর ধরে প্রসূতি মা ও শিশুদের সেবা এবং টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করে আসা স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান রাড্ডা এমসিএইচএফপির কার্যালয়ের ভবনের দেয়াল গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। টিকা ও চিকিৎসা দেওয়ার সরঞ্জাম ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে আছে। চেয়ার, টেবিল, এসিসহ সব আসবাবপত্রও লণ্ডভণ্ড। দেখে মনে হয় যেন ধ্বংসস্তূপ।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সরেজমিন এমন পরিস্থিতিই দেখা যায়। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে প্রতিষ্ঠানটিতে ভাঙচুর ও লুটপাটের এ ঘটনা ঘটে।
এ নিয়ে দেশজুড়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। রাতের আঁধারে একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে কেন এভাবে হামলা-ভাঙচুর চালানো হলো, এই প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। এই ঘটনার সমালোচনা করে সামাজিক মাধ্যমেও লিখছেন কেউ কেউ।
প্রতিষ্ঠানটির কর্মী, দায়ের করা মামলার এজাহার এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে ঘটনাটি জমি দখল সংক্রান্ত বিষয় বলেই মনে করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
রাতের আধাঁরে কেন এভাবে হামলা চালিয়ে প্রতিষ্ঠানটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো এবং কারা এই কাজের সঙ্গে জড়িত সেই প্রশ্নেরও উত্তরও খুঁজছে পুলিশ।
তবে এই ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধেও। কয়েক ঘণ্টা ধরে ভাঙচুর লুটপাটের ঘটনা ঘটলেও পুলিশ কেন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়নি, এই প্রশ্নও উঠেছে।
পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ। এ ছাড়া, এই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।
মিরপুর শাহ আলী মাজার সংলগ্ন ছিন্নমূল শপিং কমপ্লেক্সের পেছনেই বেসরকারি সংস্থা রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার এর কার্যালয়। বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাজার ও শপিং কমপ্লেক্সে ঘেরা এই এলাকায় গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানটিতে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে দুই থেকে আড়াই শ ব্যক্তি হামলা চালায়।
দুইজন নিরাপত্তারক্ষীকে জিম্মি করে রাতের আঁধারেই গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় প্রতিষ্ঠানটির একটি পাকা ও তিনটি আধাপাকা ঘর। এ সময় সরকারি ইপিআইয়ের টিকা, ওষুধ-ভ্যাকসিন, নগদ টাকা, আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন, জেনারেটর, ফ্রিজ, এসিসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র লুট করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়।
শনিবার প্রতিষ্ঠানটির মূল ফটক তালাবদ্ধ অবস্থায় দেখা যায়। সেখানে কয়েকজনকে সরকারি টিকাদান কর্মসূচির দুটি ব্যানার টাঙিয়ে বসে থাকতে দেখা যায়।
তারা জানান, কার্যালয়ে ভাঙচুর হওয়ায় বাইরে বসেই টিকাদান কর্মসূচি চালু রেখেছেন।
প্রতিষ্ঠানটির মূল ফটকে আরেকটি সাইনবোর্ড ঝুলতে দেখা যায়। সেখানে লেখা রয়েছে, ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ থেকে বরাদ্দ পাওয়া ও রেজিস্ট্রি মূলে এই প্লটের মালিক সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড। জমির পরিমাণ ১০ কাঠা।’
এই ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ কী বা কাদের সমিতি সে ব্যাপারে স্থানীয় কয়েকজনের কাছে জানতে চাইলে কেউ কিছু বলতে চাননি।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির পেছনের দিকে ভাঙচুরের ভয়াবহ দৃশ্য দেখা যায়। সড়ক ঘেঁষে তৈরি করা সীমানা প্রাচীর ভাঙা এবং সেখান থেকে মূল ঘরগুলোর বেহাল অবস্থা বাইরে থেকেই দৃশ্যমান।
ভাঙচুরের ঘটনা নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করলেও স্থানীয়দের অনেকেই এ নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই এলাকার একজন ব্যবসায়ী বলেন, ‘রাতে শুনছি ভাঙছে, আর কী হইছে জানি না, পুলিশ আইছিলো। আমরা ব্যবসা করে খাই, ঝামেলায় জড়াতে চাই না।’
আরেকজন ব্যবসায়ী জানান, এই জমি নিয়ে গত পাঁচ-ছয় বছর ধরেই জটিলতা চলছে। এর আগেও জায়গা খালি করা নিয়ে নানা ঘটনা ঘটেছে।
তিনি বলেন, ‘অনেকদিন ধরেই এখানে ক্লিনিকটা আছে, জায়গার মালিক তারা কি না জানি না, সাইনবোর্ডে লেখা আছে দোকান মালিকদের জমি। আগেও শুনছি এই জমি নিয়া ঝামেলা হইছে।’
এই ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার বাদী হয়ে ঢাকার শাহআলী থানায় যে মামলাটি করেছেন, সেখানে দাবি করা হয়, প্রায় ৫০ বছর যাবৎ সরকারি চুক্তিপত্রের মাধ্যমে এই জমিটি ব্যবহার করছেন তারা।
বৃহস্পতিবার রাতের এই হামলায় প্রতিষ্ঠানটির সব মিলিয়ে এক কোটি নয় লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং হামলার পর দুর্বৃত্তরা প্রতিষ্ঠানটির দেওয়ালে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যানার টানিয়ে দেয় বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
এই মামলায় হানিফ মিয়া নামে এক ব্যক্তির পরিচয় উল্লেখ করে ২০০ থেকে ২৫০ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।
নাসরিন আখতার বলেন, ‘১৯৭৬ সাল থেকে এই জমিটি ব্যবহার করছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি। সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে জমিটি পেয়েছি।’
তিনি জানান, এরপর থেকে অনেকবার এই চুক্তি নবায়ন করা হয়েছে। বিভিন্ন সময় একাধিক ব্যক্তি জমিটির মালিকানা দাবি করেছেন বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, ‘১৯৭৬ সাল থেকে সরকারের কাছ থেকে জমিটি পেয়ে এখানে কাজ করছি আমরা। এই জমি নিয়ে এর আগেও মামলা পাল্টা মামলার ঘটনা ঘটেছে।’
স্বল্প আয়ের পরিবারের নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া লক্ষ্যে ১৯৭৪ সালে মিরপুর এলাকায় রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার যাত্রা শুরু করে বলে এর ওয়েবসাইটে লেখা আছে।
এর তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক এনজিও ‘রাড্ডা বার্নেন’ (তৎকালীন সুইডিশ ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’) ঢাকা মহানগরীর অন্তর্ভুক্ত মিরপুর এলাকার সুবিধাবঞ্চিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার লক্ষ্যে একটি প্রকল্প হিসেবে এই কেন্দ্রটির কার্যক্রম শুরু করে।
সেই ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা, গর্ভকালীন ও প্রসব-পরবর্তী যত্ন, শিশুদের টিকাদান এবং শিশু স্বাস্থ্য সংক্রান্ত নানা বিষয়ে কাজের পাশাপাশি কমিউনিটি পর্যায়েও স্বাস্থ্য কার্যক্রম পরিচালনা করে তারা। মিরপুর এলাকায় বেসরকারি এই প্রতিষ্ঠানটির আরও কয়েকটি ক্লিনিক ও কমিউনিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মিরপুর ও পল্লবী এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। বিশেষ করে আশপাশের অনেকেই জায়গাটিকে টিকাদান কেন্দ্র হিসেবেই চেনেন।
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার বলেন, ‘জমি নিয়ে কোনো বিরোধ থাকলে আইনের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া যেত। ভাঙচুর ও লুটপাটের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।’
তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘আমাদেরকে সরকার জায়গাটি ব্যবহার করতে দিয়েছে। সরকার বললে আমরা সরে যেতাম। কিন্তু হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট করে একটি স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠানের এই হাল কেন করা হলো?’
প্রতিষ্ঠানটিতে হামলার ঘটনা অবাক করেছে ওই এলাকার বাসিন্দাদেরও। একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও লুটপাটের এই ঘটনায় তাদের অনেকে উদ্বেগ জানিয়েছেন।
সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া পোস্টে এই ঘটনা নিয়ে সমালোচনা করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও। জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।
জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান।
ঘটনাটিকে অনাকাঙ্ক্ষিত বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন।
মন্ত্রী বলেন, ‘এটার মালিকানা কার আমার জানা নাই। জমি নিয়ে বিরোধ থাকতেই পারে। কিন্তু তার মানে এই না যে রাতের আঁধারে কেউ ভেঙে ফেলবে। মালিকানা নিয়ে সমস্যা থাকলে কোর্টে সমাধান হবে।’
শনিবার বিকেলে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ। এ সময় সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যতটা সময় ধরে ভাঙচুর চালানো হয়েছে সেটি খুব কম সময়ের মধ্যে সম্ভব নয়।’
তিনি বলেন, ‘আধঘণ্টা বা একঘণ্টায় এভাবে ভাংচুর করা সম্ভব নয়। এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যান্য আসামিদের গ্রেপ্তারের নির্দেশনা আছে।’
এই ঘটনায় পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগও তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
ডিএমপি কমিশনার, ‘অপরাধী যেই হোক না কেন তাকে আইনের আওতায় নিয়ে আসবো। রাজনৈতিক পরিচয় দেখবো না।’
এই ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বলেও জানানো হয়।