পে-কমিশনের কাছে বিকল্প হিসেবে ‘সাকুল্য বেতন’ বা ‘পারিশ্রমিক’ নামে একটি নতুন বেতন কাঠামো প্রবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে অর্থ বিভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতি।
এ বিকল্প কাঠামো গ্রহণ করা হলে, বিদ্যমান বেতন কাঠামোর অধীনে থাকা ভাতাসহ কোনো ধরনের আর্থিক বা অনার্থিক সুবিধাই বহাল থাকবে না। এ ধরনের কাঠামো উন্নত এবং উন্নয়নশীল বহু দেশে চালু রয়েছে। সংগঠনটি ‘সচিবালয় ভাতা’ এবং ‘রেশন সুবিধা’ সুবিধার মতো ‘বিশেষ সুবিধার’ কথাও বলেছে।
‘সাকুল্য বেতন’ কি
‘সাকুল্য বেতন’ হলো একটি নির্দিষ্ট সময়ে একজন কর্মচারীর মূল বেতন, অন্যান্য ভাতাদি, বোনাস এবং সব ধরনের আর্থিক সুবিধাসহ মোট প্রাপ্তি। এটি একটি একক হিসাব যেখানে বেতনের সমস্ত উপাদান একত্রিত করা হয়, যা শুধুমাত্র মূল বেতনের চেয়ে বেশি।
সাকুল্য বেতনের ধারণা
ভাতা বাদ: এ কাঠামোতে বিদ্যমান বেতন কাঠামোর আওতায় থাকা বিভিন্ন ধরনের ভাতা (আর্থিক ও অনার্থিক) থাকবে না।
একক বেতন: মূল বেতন এবং সব ধরনের ভাতার পরিমাণকে একত্রিত করে একটি একক ও সামগ্রিক বেতন কাঠামো তৈরি করা হবে।
রোববার অর্থ বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে এ কথা বলেছেন জাতীয় বেতন কমিশনের সভাপতি সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খান। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
জাতীয় পে-কমিশন কার্যালয়ে ওই বৈঠকে অর্থ বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির নেতারা নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে ১৩টি প্রস্তাব তুলে ধরেন। নতুন বেতন কাঠামোতে ১:৬ হারে সর্বনিম্ন ২৫ হাজার এবং সর্বোচ্চ ১ এক লাখ ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়। বর্তমান ১:১০ হার অর্থ সর্বনিম্ন ৮ হাজার ২৫০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার টাকা আছে।
বৈঠক শেষে অর্থ বিভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির সভাপতি মো. হাবিবুর রহমান বলেন, আমরা চাকরিজীবীদের বেতন সমান অনুপাতে বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছি। সেখানে বলা হয়েছে, বড় কর্মকর্তাদের বড় অঙ্কের বেতন বাড়বে এবং ছোটদের একেবারেই কম বাড়বে-এমন যেন না হয়। এজন্য বেতন অনুপাত ১:৬ হার নির্ধারণ করতে বলা হয়েছে।
সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মনিরুল আলম বলেছেন, সরকারি চাকরিজীবীদের চিকিৎসা, টিফিন ও যাতায়াত ভাতা বাড়ানোর যৌক্তিকতা কমিশনের সামনে বলা হয়েছে। কারণ একজন অফিস সহায়কের বেসিক হচ্ছে ৮ হাজার ২৫০ টাকা। এই বেসিকে যে হারে বাসা ভাড়া পাওয়া যায় তা দিয়ে ঢাকার নিম্নাঞ্চলের বস্তিতেও থাকা সম্ভব নয়। একই পদে গ্রামে নিজ বাড়িতে থেকে যিনি অফিস করছেন তার জন্য এই বাড়ি ভাড়া বাড়তি সুবিধা। এগুলো সমন্বয় করতে বলা হয়েছে।
মনিরুল আলম আরও বলেন, টিফিন ভাতা দেওয়া হয় মাসে ২০০ টাকা এবং যাতায়াত ভাতা ৩০০ টাকা। ওই হিসাবে একজন চাকরিজীবী দৈনিক টিফিন ভাতা ৯ টাকা এবং যাতায়াত ভাতা ১৩ টাকা পাচ্ছেন। এই টিফিন ভাতার টাকা দিয়ে কিছুই হয় না। আর ১৩ টাকা দিয়ে রিকশা ভাড়া বা বাস ভাড়াও মেটানো সম্ভব নয়। এসব বৈষম্য তুলে ধরা হয়েছে।
সূত্রমতে, ওই বৈঠকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রতি চার বছর অন্তর একটি গ্রেড দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ১০ বছর অন্তর ও ১৬ বছর পর দুটি উচ্চতর গ্রেড দেওয়া হচ্ছে।
বৈঠকে ‘সাকুল্য বেতন’ বা ‘পারিশ্রমিক’ নামে বিকল্প বেতন কাঠামো গঠনের কথা বলা হয়েছে। যেখানে বিদ্যমান বেতন কাঠামোর ভাতাসহ আর্থিক ও অনার্থিক কোনো সুবিধাই থাকবে না।
সূত্র আরও জানায়, সচিবালয়ে নিয়োজিত সব পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য ‘সচিবালয় ভাতা’ এবং ‘রেশন সুবিধা’ চালুর কথা বলা হয়েছে। এর যৌক্তিকতা দেখানো হয়-সচিবালয়ে নিয়োজিত জনবল সরকারের সামগ্রিক কার্যক্রম পরিচালনায় মূল চালিকাশক্তি। কাজের গুরুত্ব ও দায়িত্বে ভিন্নতা বিবেচনায় সরকারের বেশকিছু দপ্তর এরূপ ভাতা দিচ্ছে।
এ সময় কল্যাণ সমিতির নেতাদের কাছে কমিশনের সদস্য সাবেক সচিব তাহমিনা বেগম জানতে চান অন্য কোন কোন কার্যালয় এ ধরনের সুবিধা দিচ্ছে। জবাবে নেতারা বলেন, রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে ‘টিপটপ ভাতা’; সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, বিজিবিসহ বিভিন্ন বাহিনী, দুর্নীতি দমন কমিশনে নিয়োজিত জনবলের জন্য ‘রেশন সুবিধা’ ও ‘ঝুঁকি ভাতা’ এবং জুডিশিয়ারি ক্যাডারভুক্তদের জন্য ‘বিশেষ ভাতা’ চালু আছে। বৈঠকে প্রতিবছর শ্রান্তি বিনোদনের জন্য ৭ দিন ছুটির প্রস্তাব দেওয়া হলে এটি সমর্থন করেন কমিশনের সদস্য সাবেক সচিব ড. মোহাম্মদ আলী খান।
সমিতির নেতারা আরও জানান, এছাড়া টাইম স্কেল, সিলেকশন গ্রেড, বিশেষ ইনক্রিমেন্টসহ অন্যান্য সুবিধা পুনর্বহাল, বিদ্যমান বেতন স্কেলের অপ্রয়োজনীয় কিংবা কম ব্যবহৃত গ্রেডগুলো বাদ দিয়ে মোট ১২টি গ্রেড নির্ধারণ করতে বলা হয়েছে। এছাড়া ‘নববর্ষ ভাতা’র হার মূল বেতনের ৮০ শতাংশ নির্ধারণ, ‘স্বাস্থ্যবিমা’ চালু, কর্মচারীদের করের আওতায় অন্তর্ভুক্ত এবং প্রদত্ত করের ভিত্তিতে একটি নির্দিষ্ট বয়সের পর ‘পেনশন’-এর প্রস্তাব দেওয়া হয়। বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সদস্য সাবেক হিসাব মহানিয়ন্ত্রক মো. মোসলেম উদ্দীন প্রমুখ।

